প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৫, ১০:২০ এএম

সামরিক পদক্ষেপে গড়াচ্ছে পাক-ভারত উত্তেজনা
ভারত শাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে হামলার পর থেকে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বাড়ছেই। শেষ পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপে গড়ায় কিনা তা নিয়ে চলছে ব্যাপক জল্পনাকল্পনার। গতকাল পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিতীয় দিনের মতো গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।বিবিসির খবরে বলা হয়, গত ২২ এপ্রিল পহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জনের মৃত্যুর পর সীমান্তের একদিকে যেমন ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের’ দাবি জোরালো হয়েছে তেমনই অন্যপ্রান্তে ‘সমুচিত জবাব’ দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প নেওয়া হয়েছে। অতীতে উরি ও পুলওয়ামায় হামলার পর ভারত যে কৌশল অবলম্বন করেছিল। দুই ক্ষেত্রেই ভারত সরকারের নির্দেশে আন্তঃসীমান্ত অভিযান চালানো হয়েছিল। সেই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। পুলওয়ামার ঘটনার পর ভারতের তরফে বালাকোটে বিমান হামলা চালানো হয়। এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ পাকিস্তান পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছিল। এই আবহে যখন ভারতীয় বিমানবাহিনীর কমপক্ষে একটা বিমান ধ্বংস এবং ভারতীয় পাইলটকে আটক করে পাকিস্তান, তখন দুই দেশের মধ্যে বড়সড় আকারের সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।পহেলগামে ২২ এপ্রিল হামলার পর ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটা পদক্ষেপ নেয়। এরমধ্যে সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি স্থগিত করা, ওয়াঘা-আটারি সীমান্ত বন্ধ করা, ভিসা সুবিধা প্রত্যাহার করা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করাসহ একাধিক সিদ্ধান্ত সেই তালিকায় আছে। এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ পাকিস্তানের তরফে সিমলা চুক্তি স্থগিত, সীমান্ত বন্ধ করা, বাণিজ্য স্থগিত, ভারতের উপর পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।ভারতের মতো পাকিস্তানও প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ও তাদের সহযোগীদের দেশ ছাড়তে এবং কূটনীতিকদের সংখ্যা সীমিত করতে বলেছে। পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি ভারতের তরফে নেওয়া সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। জানানো হয়েছে, ভারত যদি এই চুক্তি থেকে সরে এসে পাকিস্তানের দিকে জলপ্রবাহ বন্ধ করে বা পানি অন্যদিকে চালিত করার চেষ্টা করে, তাহলে তা যুদ্ধের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। পূর্ণ শক্তি দিয়ে এর জবাব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান।ভারতের জলশক্তিমন্ত্রী চন্দ্রকান্ত রঘুনাথ পাতিল জানিয়ে দিয়েছেন, সিন্ধু নদের পানিবণ্টন নিয়ে স্বাক্ষরিত চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত কীভাবে কার্যকর করা সম্ভব, সে নিয়ে ভারত এখনো স্পষ্ট রূপরেখা ঠিক করতে পারেনি। তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ডাকা বৈঠকে যোগ দেওয়ার পর ভারতের জলশক্তিমন্ত্রী চন্দ্রকান্ত রঘুনাথ পাতিল গণমাধ্যমকে বলেন, সিন্ধু উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলোর এক ফোঁটা পানিও যাতে পাকিস্তানে না যায়, আমরা তা নিশ্চিত করব। এক ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে পাতিল লেখেন, ‘সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে মোদি সরকারের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আইনসংগত ও জাতীয় স্বার্থে গৃহীত। আমরা নিশ্চিত করব, এক ফোঁটা পানিও যাতে পাকিস্তানে প্রবাহিত না হয়।’ তবে, সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে ভারত ‘বিশ্বে একঘরে’ হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো। এদিকে কাশ্মীরের পেহেলগামের বন্দুক হামলার ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্ত চেয়েছে পাকিস্তান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগ করেন, ভারত সিন্ধু নদের পানিচুক্তি বাতিলের অজুহাত হিসেবে পেহেলগামের হামলাকে ব্যবহার করছে এবং কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ, তদন্ত ছাড়াই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, আমরা চাই না যে, যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠুক। কারণ এমন পরিস্থিতি দেখা দিলে সেটি এই পুরো অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের জন্য পাকিস্তান প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, পাকিস্তান একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে, এই বিষয়ে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। ভিত্তিহীন ও অপ্রমাণিত আখ্যা দিয়ে ভারতের অভিযোগকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। চলমান উত্তেজনা ভারতীয় বিমান চলাচলের উপর প্রভাব ফেলেছে। পাকিস্তান ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে মাত্র ১৬ ঘন্টার মধ্যে ৬০টিরও বেশি বিমান চলাচলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে এবং রুট পরিবর্তন করতে হয়েছে, যার ফলে লাখ লাখ টাকার লোকসান হয়েছে।এদিকে ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুক হামলায় ২৬ জন নিহতের ঘটনায় সৃষ্ট পাকিস্তান-ভারত উত্তেজনা নিরসনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক এক্স পোস্টে এ প্রস্তাব দেন। এক্স পোস্টে আরাগচি লেখেন, ভারত ও পাকিস্তান ইরানের ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী। আমরা এমন সম্পর্ক উপভোগ করছি যা কয়েক শতক পুরোনো সাংস্কৃতিক সভ্যতায় নিহিত। অন্যান্য প্রতিবেশীর মতো তাদেরও আমরা সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করি। ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লিতে থাকা আমাদের দূতাবাসের মাধ্যমে আমরা এই কঠিন সময়ে দুই দেশের মধ্যে বৃহৎ বোঝাপড়া তৈরি করতে চাই। এছাড়া ভারত ও পাকিস্তানের পরিস্থিতির ওপর ‘খুব গভীর মনোযোগ’ দিচ্ছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে এ কথা বলেছেন। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি।
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন
© thegalaxynews.com
























