ধর্ম

রমজান সংযমের মাস, ভোগবিলাসের নয়

Icon

দ্যা গ্যালাক্সি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম

রমজান সংযমের মাস, ভোগবিলাসের নয়

ইফতারে অপচয় কি রমজানের চেতনা ক্ষুণ্ন করছে?

রমজান মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের মাস। এটি কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; বরং নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহভীতি অর্জনের এক অনন্য প্রশিক্ষণ। এই মাস আমাদের শেখায় ক্ষুধার কষ্ট উপলব্ধি করতে, যাতে আমরা অসহায় ও দরিদ্র মানুষের দুঃখ বুঝতে পারি।

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআন-এ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ … لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর করা হয়েছিল—যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সুরা বাকারা: ১৮৩)

এ আয়াতে রোজার মূল লক্ষ্য হিসেবে তাকওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সত্যিই রমজানকে সংযমের মাস হিসেবে পালন করছি, নাকি এটি ক্রমেই ভোগবিলাস ও প্রদর্শনীর মাসে রূপ নিচ্ছে?

ইফতারে অপচয় ও বিলাসিতা

বর্তমানে ইফতার আয়োজন অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার রূপ নিয়েছে। কে কত বৈচিত্র্যময় খাবার পরিবেশন করবে, কার আয়োজন কত জাঁকজমকপূর্ণ হবে—এ যেন এক অলিখিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাহারি ইফতারের ছবি, হোটেল-রেস্তোরাঁয় বিলাসী আয়োজন—এসব যেন সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে।

অথচ আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন:
كُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
“খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।” (সুরা আরাফ: ৩১)

খাদ্যের অপচয়ও গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। ইফতারের পর ডাস্টবিনে পড়ে থাকা অব্যবহৃত খাবার আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

নবী করিম মুহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত সরল জীবনযাপন করতেন। তিনি তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন; তা না থাকলে শুকনা খেজুর, আর সেটিও না থাকলে কয়েক ঢোক পানি পান করতেন (সুনানু আবি দাউদ: ২৩৫৬)। তাঁর এই সুন্নাহ আমাদের জন্য সংযম ও সরলতার অনন্য দৃষ্টান্ত।

দরিদ্রের অধিকার স্মরণ

রমজান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজে এমন বহু মানুষ আছেন যারা সামান্য খাবারেই ইফতার করেন। অথচ আমরা কখনো কখনো একবেলার ইফতারে এমন ব্যয় করি, যা অনেক পরিবারের মাসিক আয়ের সমান।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
“তাদের সম্পদে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতের নির্ধারিত অধিকার রয়েছে।” (সুরা জারিয়াত: ১৯)

এ আয়াত স্পষ্ট করে যে, দরিদ্রের প্রতি সহায়তা করা কেবল অনুগ্রহ নয়; এটি তাদের অধিকার।

আরও বলা হয়েছে:
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا
“তারা আল্লাহর ভালোবাসায় খাদ্য দান করে মিসকিন, ইয়াতিম ও বন্দিকে।” (সুরা দাহার: ৮)

রমজানে দানশীলতার গুরুত্ব আরও বেশি। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সবচেয়ে দানশীল ব্যক্তি, আর রমজানে তিনি আরও অধিক দানশীল হয়ে উঠতেন (সহিহ বুখারি: ৬)।

সময়োপযোগী করণীয়

বর্তমান বাস্তবতায় কিছু সচেতন পদক্ষেপ জরুরি—
১. প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত ইফতার প্রস্তুত করা।
২. অতিরিক্ত খাবার দরিদ্রদের মধ্যে বা মসজিদে বিতরণ করা।
৩. ইবাদতের মাসকে সামাজিক প্রদর্শনীর মঞ্চে পরিণত না করা।
৪. পরিবারে সংযম ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেওয়া।
৫. অপচয়ের অর্থ সঞ্চয় করে দান-সদকায় ব্যয় করা।

রমজান আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। যদি আমরা তাকওয়ার মূল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে কেবল বাহারি আয়োজনেই ব্যস্ত থাকি, তবে রোজার প্রকৃত চেতনা ক্ষুণ্ন হবে।

আসুন, রমজানকে ভোগবিলাসের নয়; বরং সংযম, সহমর্মিতা ও তাকওয়ার মাস হিসেবে গড়ে তুলি। তবেই এ মাস আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে, ইনশাআল্লাহ।

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

© thegalaxynews.com

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ধর্ম থেকে আরো

কোরআনের দৃষ্টিতে উট: সৃষ্টির এক অপূর্ব নিদর্শন

কোরআনের দৃষ্টিতে উট: সৃষ্টির এক অপূর্ব নিদর্শন

মাথায় তেল ব্যবহার করলে রোজা ভেঙে যাবে?

মাথায় তেল ব্যবহার করলে রোজা ভেঙে যাবে?

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ইহুদিদের প্রতি অভিসম্পাত

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ইহুদিদের প্রতি অভিসম্পাত

রমজানে যে কাজগুলো থেকে বিরত থাকা জরুরি

রমজানে যে কাজগুলো থেকে বিরত থাকা জরুরি

সম্পাদক : মো নুরুজ্জামান মনি

অনুসরণ করুন