ধর্ম

বাংলাদেশ–সৌদি ঈদ ভিন্ন দিনে: কারণ কী

Icon

দ্যা গ্যালাক্সি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম

বাংলাদেশ–সৌদি ঈদ ভিন্ন দিনে: কারণ কী

ঢাকা: বাংলাদেশ ও সৌদি আরব–এর সময়ের পার্থক্য মাত্র তিন ঘণ্টা। কিন্তু প্রায় প্রতি বছরই দেখা যায়, সৌদিতে ঈদ পালিত হয় একদিন আগে, আর বাংলাদেশে পরের দিন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধান কীভাবে ২৪ ঘণ্টার তারিখ পার্থক্যে রূপ নেয়?

ইসলামি ক্যালেন্ডার সম্পূর্ণ চন্দ্রনির্ভর। নতুন মাস শুরু হয় নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে চাঁদের জন্মমুহূর্ত (conjunction) সারা পৃথিবীতে একই সময়ে ঘটে, তবে তখনই তা খালি চোখে দেখা যায় না।

চাঁদ দৃশ্যমান হতে হলে তার নির্দিষ্ট বয়স, সূর্য থেকে কৌণিক দূরত্ব এবং সূর্যাস্তের সময় দিগন্তের ওপরে পর্যাপ্ত উচ্চতায় থাকা জরুরি। সাধারণভাবে সূর্য ও চাঁদের মাঝে কমপক্ষে প্রায় ১০.৫ ডিগ্রি কোণ তৈরি না হলে খালি চোখে চাঁদ দেখা কঠিন। এই অবস্থায় পৌঁছাতে চাঁদের প্রায় ১৭ থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে।

পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘোরে। তাই সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে নতুন চাঁদ প্রথমে পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশগুলোতে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যেহেতু বাংলাদেশ সৌদি আরবের পূর্বে অবস্থিত, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সৌদিতে সূর্যাস্তের সময় চাঁদ দৃশ্যমান হলেও বাংলাদেশে তখন তা দৃশ্যমানতার শর্ত পূরণ করে না। ফলে বাংলাদেশকে পরবর্তী দিনের সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এখানেই তিন ঘণ্টার সময় পার্থক্য একদিনের ক্যালেন্ডার ব্যবধানে রূপ নেয়।

ভৌগোলিক বিশ্লেষকদের মতে, এক নতুন চাঁদ থেকে আরেক নতুন চাঁদ পর্যন্ত সময় গড়ে ২৯.৫ দিন—যাকে সিনোডিক মাস বলা হয়। NASA–এর তথ্য অনুযায়ী, এর সুনির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট ৩ সেকেন্ড।

এই হিসেবে চন্দ্রবর্ষ হয় ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিন, যা সৌরবর্ষের তুলনায় প্রায় ১১ দিন কম। ফলে প্রতি বছর ঈদ ইংরেজি ক্যালেন্ডারে প্রায় ১০–১১ দিন করে এগিয়ে আসে।

মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের পূর্বে থাকা দেশ—যেমন জাপান বা ইন্দোনেশিয়া—কখনও কখনও সৌদি আরবের সঙ্গে একই দিনে ঈদ পালন করে। কারণ নির্দিষ্ট দিনে সূর্য ও চাঁদের মধ্যবর্তী কোণ জাপানে দৃশ্যমানতার মানদণ্ড পূরণ করলেও বাংলাদেশে তা নাও করতে পারে। আবার কখনও আবহাওয়া ও দিগন্তের অবস্থানের কারণেও চাঁদ দেখা যায় না।

বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পশ্চিম ও পূর্ব—দুই দিক থেকেই বাংলাদেশ অনেক সময় একদিন পিছিয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি দেশের সীমানার মধ্যে চাঁদ দেখার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মাস শুরুর ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে সৌদি আরব তাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। এই নীতিগত পার্থক্যও তারিখের ভিন্নতার একটি কারণ।

আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে চাঁদের অবস্থান ও দৃশ্যমানতা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে গণনা করা সম্ভব বলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মত দেন। বিশ্বের কিছু দেশ—যেমন তুরস্ক—আগাম জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবের ভিত্তিতে ইসলামি ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করছে। তবে আলেমদের একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার পক্ষে মত দেন।

তারেক রহমান ২০২৫ সালের ২ মার্চ লন্ডন থেকে এক ভার্চুয়াল ইফতার মাহফিলে বক্তব্য দিয়ে বলেন, আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তির যুগে মুসলিম উম্মাহর উচিত একই দিনে রোজা ও ঈদ পালনের উপায় খোঁজা।

অন্যদিকে দেশের আলেমদের একাংশের মতে, শরীয়তে স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক মত দেন, ভৌগোলিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় সারা বিশ্বে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন কার্যত সম্ভব নয়; কুরআন-হাদিসে চাঁদ দেখে রোজা রাখা ও ভাঙার নির্দেশনা রয়েছে, বৈশ্বিক একতার ভিত্তিতে একদিনে উদযাপনের বাধ্যবাধকতা নেই।

বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে ঈদের একদিনের ব্যবধান ঘড়ির সময়ের কারণে নয়। এটি চাঁদের অবস্থান, সূর্যাস্তের সময়, পৃথিবীর ঘূর্ণন, আবহাওয়া এবং স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতির সমন্বিত ফল।

যতদিন পর্যন্ত প্রতিটি দেশ নিজ নিজ ভূখণ্ডে চাঁদ দেখার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে, ততদিন এই একদিনের পার্থক্য থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

© thegalaxynews.com

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ধর্ম থেকে আরো

সৌদি পৌঁছেছেন ৫৯ হাজার ১০১ হজযাত্রী

সৌদি পৌঁছেছেন ৫৯ হাজার ১০১ হজযাত্রী

স্ত্রীর ওয়াজিব কোরবানি স্বামীর টাকায় আদায় হবে কি?

স্ত্রীর ওয়াজিব কোরবানি স্বামীর টাকায় আদায় হবে কি?

লাইলাতুল কদর: মহিমান্বিত রাত

লাইলাতুল কদর: মহিমান্বিত রাত

যুক্তরাজ্যে ইসলামিক সামার ক্যাম্প নিয়ে বিতর্ক: শিশুদের উগ্র আদর্শে ‘গড়ার’ অভিযোগ

যুক্তরাজ্যে ইসলামিক সামার ক্যাম্প নিয়ে বিতর্ক: শিশুদের উগ্র আদর্শে ‘গড়ার’ অভিযোগ

সম্পাদক : মো নুরুজ্জামান মনি

অনুসরণ করুন