প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৫, ০৪:৫২ পিএম

যুক্তরাজ্যের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটিতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে লন্ডনের চারটি আসনে নির্বাচিত লেবার পার্টির চারজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নারী এমপির অবস্থান নিয়ে। এরা হলেন—রুশনারা আলী (বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো), আপসানা বেগম (পপলার অ্যান্ড লাইমহাউজ), রূপা হক (ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন) এবং টিউলিপ সিদ্দিক (হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট)।
যদিও এসব এলাকা ঐতিহ্যগতভাবে লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সাম্প্রতিক জরিপ সংস্থা ইউগভ-এর পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকের উত্থান এই আসনগুলোতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জোরালো করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশি ভোটব্যাংক ও লেবারের নির্ভরতা
২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ব্রিটিশ-বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ৬.৫ লাখ, যার একটি বড় অংশ পূর্ব লন্ডনসহ বৃহত্তর লন্ডন অঞ্চলে বসবাস করে। বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় বাংলাদেশিরা জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এতদিন এই জনভিত্তির ওপর নির্ভর করে লেবার পার্টি সেখানে তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছে। তবে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই নির্ভরতা এখন প্রশ্নের মুখে।
আপসানা বেগমের দলীয় সংকট
লেবার এমপি আপসানা বেগম সম্প্রতি সংসদে একটি বিতর্কিত সংশোধনীতে দলের বিপক্ষে ভোট দিয়ে হুইপ হারিয়েছেন। সংশোধনীটি শিশু ভাতার বিষয়ে ছিল এবং তিনি দলের অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে নিজের বিবেকের অনুসরণ করেন। ফলে তার ভবিষ্যৎ দলীয় মনোনয়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যদি তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান, তাহলে লেবার ভোট বিভাজনের শঙ্কা বাড়বে।
অতীতে পূর্ব লন্ডনের বিভিন্ন নির্বাচনে দেখা গেছে, একাধিক বাংলাদেশি প্রার্থী এক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রগতিশীল ভোট বিভক্ত করেছেন, যার সুফল তুলেছে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো।
রিফর্ম ইউকের নতুন কৌশল
গাজায় যুদ্ধ, যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যনীতি ও অভিবাসন নিয়ে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে মুসলিম ভোটারদের মধ্যে। এ অবস্থায় রিফর্ম ইউকে তাদের নির্বাচনি কৌশল পরিবর্তন করে দক্ষিণ এশীয় ও মুসলিম পটভূমির প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার কথা ভাবছে, যারা স্থানীয় ক্ষোভ ও উদ্বেগকে কাজে লাগাতে সক্ষম।
এ লক্ষ্যেই দলটি মুসলিম রাজনীতিক জিয়া ইউসুফকে সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়, যা তাদের বহুমাত্রিক কৌশলেরই অংশ। ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ব লন্ডনের মতো এলাকায় ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বা মুসলিম প্রার্থীর মাধ্যমে রিফর্ম ইউকে সমর্থন বিস্তারে সচেষ্ট হবে।
অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা
রিফর্ম ইউকে অভিবাসন বিষয়ে ‘নেট জিরো’ নীতি বাস্তবায়নের পক্ষে, যার অর্থ আগত ও প্রস্থানকারী অভিবাসীর সংখ্যা সমান রাখতে হবে। এতে দক্ষ শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও পরিবারের পুনর্মিলনের সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে। দলটি নাগরিকত্ব অর্জনের সময়সীমা ৫ বছর থেকে ১০ বছরে বাড়াতে চায় এবং নতুন অভিবাসীদের জন্য পাঁচ বছর ভাতা না দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
এই কঠোর অবস্থান মূলত দক্ষিণ এশীয়, বিশেষ করে বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি অভিবাসীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৩ সালে শুধু লন্ডনেই নিট অভিবাসনের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার—এদের বড় অংশই দক্ষিণ এশিয়া থেকে আগত।
সরকারি সেবায় কাটছাঁটের সম্ভাব্য প্রভাব
রিফর্ম ইউকে দাবি করছে, তারা সরকারি ব্যয় কমিয়ে ‘অপচয় রোধ’ করতে চায়। এর অংশ হিসেবে সমাজকল্যাণমূলক খাতে বড় আকারে কাটছাঁটের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের তুলনায় বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের দারিদ্র্য হার বেশি এবং সরকারি সেবার ওপর নির্ভরতাও তুলনামূলক বেশি, ফলে এমন পদক্ষেপে এই সম্প্রদায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রাজনীতির নতুন মোড়
রিফর্ম ইউকের উত্থান ব্রিটিশ রাজনীতির দৃশ্যপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। শুধু রাজনৈতিক পালাবদল নয়, এটি ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির অবস্থান এবং প্রভাব পুনঃনির্ধারণের সুযোগ কিংবা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
২০২৫ সালের নির্বাচন হতে পারে শুধু সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়, বরং ব্রিটেনের রাজনৈতিক পরিচয় ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। বিশেষ করে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের জন্য এটি হতে পারে নিজেদের কণ্ঠ এবং অবস্থান নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন
© thegalaxynews.com
























