আন্তর্জাতিক

অভ্যন্তরীণ সংকট ও বৈশ্বিক হুমকির চাপে কোণঠাসা যুক্তরাজ্য

Icon

দ্যা গ্যালাক্সি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৫, ০৬:০৯ পিএম

অভ্যন্তরীণ সংকট ও বৈশ্বিক হুমকির চাপে কোণঠাসা যুক্তরাজ্য

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকির সম্মিলিত চাপে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যুক্তরাজ্য। সম্প্রতি ২৪ জুন সরকার যে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল (NSS) ও কৌশলগত প্রতিরক্ষা পর্যালোচনা (SDR) প্রকাশ করেছে, তাতে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে দেশটি এমন এক যুদ্ধাবস্থার আশঙ্কায় রয়েছে, যার জন্য জনগণ প্রস্তুত নয়।

এই বাহ্যিক সংকটের পাশাপাশি দেশটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভাঙনের মধ্যেও রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে, আর রিফর্ম ইউকের মতো নতুন, জনতুষ্টিবাদী শক্তির উত্থান জনগণের অসন্তোষের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

লেবার ও কনজারভেটিভ—দুই প্রধান দলই এখন এমন এক রাজনৈতিক অবস্থা তৈরি করেছে যেখানে অর্থপূর্ণ সংস্কার অনুপস্থিত। ফলে জনগণের সঙ্গে শাসকের দূরত্ব বাড়ছে। একইসাথে বিশ্বজুড়ে ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান এই বৈরিতাকে আরও তীব্র করেছে।

নির্বাচনী জনভিত্তিতে বড় রকমের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। একসময় শ্রমজীবী মানুষের দল হিসেবে পরিচিত লেবার পার্টি এখন উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের সমর্থন পাচ্ছে, বিশেষ করে যাদের আয় বছরে £৭০,০০০-এর বেশি। এর ফলে, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, কম শিক্ষিত ও ব্রেক্সিটপন্থি ভোটাররা রিফর্ম ইউকের দিকে ঝুঁকছেন।

নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে এই শূন্যতা পূরণে নিজেদের “প্রকৃত শ্রমজীবী মানুষের দল” হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাদের নীতির মধ্যে রয়েছে—দুই সন্তানের সুবিধা বাতিল, পেনশনভোগীদের শীতকালীন ভাতা ফিরিয়ে আনা এবং কিছু খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা পুনর্বহাল।

রিফর্ম ইউকের জনপ্রিয়তার পেছনে বড় একটি কারণ তাদের অভিবাসনবিষয়ক কঠোর অবস্থান। তারা অনাবশ্যক অভিবাসন বন্ধ, অপরাধে যুক্ত বিদেশিদের দেশত্যাগে বাধ্য করা এবং নতুন অভিবাসীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও এসব প্রস্তাব কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, তবে তা দেশের বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বিশেষ করে ব্রিটিশ বাংলাদেশি, মুসলিম, দক্ষিণ এশীয় ও অন্যান্য অভিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর এসব নীতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। কঠোর ভিসা নীতিমালা, পরিবারের পুনর্মিলন বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং চাকরি ও আবাসনের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

রান্নাইমেড ট্রাস্টের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সম্পদের দিক থেকে বাংলাদেশি ও আফ্রিকান পরিবারগুলো শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ পরিবারের তুলনায় দশ গুণ পিছিয়ে। ২০২৩ সালে হোম অফিস যেসব কঠোর পারিবারিক ভিসা নীতি প্রণয়ন করেছে, তা আরও বহু পরিবারকে আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে। বাকস্বাধীনতার নামে মুসলিম সম্প্রদায়ের অনুভূতিকে আঘাত করে কুরআন পোড়ানোর মতো ঘটনাগুলো সহ্য করা হলেও, ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর ও অসম আচরণ করা হচ্ছে। এই দ্বিচারিতা মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বাড়িয়ে তুলছে।

সরকার যেখানে যুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংঘাতের জন্য সতর্ক করছে, সেখানে জনমতের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০২৫ সালের মে মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, কেবল ৩৫ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক তাদের দেশের জন্য অস্ত্র হাতে নিতে রাজি, যেখানে ৪৮ শতাংশ একেবারেই রাজি নন। এর অর্থ, সরকার ও জনগণের মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ে একটি বড় ধরনের আস্থা বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা বাজেট ২০২৪ সালে ছিল জিডিপির ২.৩ শতাংশ। ২০২৯ সালের মধ্যে তা ৩ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য পুনঃনির্বাচন, যুক্তরাজ্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

ট্রাম্পের ন্যাটো-বিরোধী অবস্থান ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়াতে বাধ্য করতে পারে। একই সঙ্গে, তার প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক যুক্তরাজ্যের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২৩ সালে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৬০ বিলিয়ন পাউন্ড পণ্য রপ্তানি করেছিল, যা দেশটির মোট রপ্তানির ১৫.৩ শতাংশ। পাশাপাশি পরিষেবা বাণিজ্যে ৭১ বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি উদ্বৃত্ত ছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য নতুন শুল্কনীতি এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

 

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

© thegalaxynews.com

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

আন্তর্জাতিক থেকে আরো

খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে যুক্তরাজ্যের মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৩.৬%

খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে যুক্তরাজ্যের মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৩.৬%

পাকিস্তান থেকে ১১ হাজারের বেশি আফগান শরণার্থীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে

পাকিস্তান থেকে ১১ হাজারের বেশি আফগান শরণার্থীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে

যুক্তরাজ্যে লিঙ্গ-সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদদের নিরাপত্তায় ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

যুক্তরাজ্যে লিঙ্গ-সমালোচনামূলক শিক্ষাবিদদের নিরাপত্তায় ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

হাসপাতালের ওয়ার্ডে সাপ ঢুকে আতঙ্ক, পরে উদ্ধার

হাসপাতালের ওয়ার্ডে সাপ ঢুকে আতঙ্ক, পরে উদ্ধার

সম্পাদক : মো নুরুজ্জামান মনি

অনুসরণ করুন